বিশেষ প্রতিবেদক:
হায়রে মানুষ! কোথায় মানবিকতা!
যে মায়ের কোলে আশ্রয় নিয়ে একদিন সন্তান পৃথিবীর আলো দেখেছে, যে মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছে একটি পরিবার, সেই বৃদ্ধ মা-ই কি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবার কাছে বোঝা হয়ে যাবেন? যে বয়সে সন্তানের সেবা-যত্ন আর একটু নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, সে বয়সে একজন অসহায় বৃদ্ধাকে পড়ে থাকতে হচ্ছে শহরের ফুটপাতে। নিশ্চই কোন স্বজন তাকে সেখানে নিরাপদ দূরত্মে সরেগেছে।
তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মানুষ কোথায়?
কক্সবাজার শহরের প্রাণকেন্দ্র থানা সড়কের মাথায় পৌর ভবনের পাশে গত কয়েক দিন ধরে ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে ষাটোর্ধ কঙ্কালসার এক বৃদ্ধাকে। কে তিনি, কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর বাড়ি কোথায় কিংবা তাঁর ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়স্বজন কারা—এসব বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে সহজেই বোঝা যায়, তিনি চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বৃদ্ধাটি ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। হাঁটাচলা করারও সামর্থ্য নেই বললেই চলে। নিজের প্রয়োজনটুকু মেটানোর সক্ষমতাও তাঁর নেই। এমন অবস্থায় ফুটপাতের ওপর পড়ে থাকা এই বৃদ্ধার প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্বের মধ্যে।
স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো স্বজন হয়তো তাঁকে সেখানে রেখে গেছেন। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি সত্যিই কোনো সন্তান, আত্মীয় কিংবা পরিচিতজন তাঁর দায়িত্ব না নিয়ে এভাবে পথে ফেলে রেখে গিয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—তাঁরা কি মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন? একজন অসহায় বৃদ্ধার প্রতি এমন আচরণ কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য?
গত কয়েক দিন ধরে এই পথ দিয়ে অসংখ্য মানুষ চলাচল করছেন। অনেকেই হয়তো বৃদ্ধাটিকে দেখছেন, কেউ কেউ তাঁর অসহায়ত্ব উপলব্ধি করছেন। কোনো কোনো পথচারী তাঁকে সামান্য খাবার ও পানি দিয়ে মানবিকতার পরিচয়ও দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর স্থায়ী আশ্রয়, চিকিৎসা ও দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কাউকে এখনো দেখা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন অসহায় বৃদ্ধার দায়িত্ব কি শুধু তাঁর পরিবারের? পরিবার যদি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় কিংবা তাঁকে পরিত্যাগ করে, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রের কি কোনো দায়িত্ব নেই? স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কি তাঁর দুর্দশা লাঘবে এগিয়ে আসতে পারেন না?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু উন্নত সড়ক, সুউচ্চ ভবন কিংবা পর্যটনকেন্দ্রের জৌলুশে নয়; বরং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তার আচরণেই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। যে সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা জীবনের শেষ সময়ে এসে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন, যে সমাজে তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে আপনজনেরা অনীহা দেখান, সেই সমাজের মানবিক মূল্যবোধ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার প্রয়োজন হয় একটু আশ্রয়, সামান্য খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর আপনজনের সঙ্গ। অথচ সেই ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ না করে কাউকে ফুটপাতে ফেলে রাখা হলে তা শুধু পারিবারিক দায়িত্বহীনতা নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, বৃদ্ধার পরিচয় শনাক্ত করা, তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা এবং দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি তাঁর স্বজনদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিতে হবে। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁদের দায়বদ্ধতা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই অসহায় বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। তাঁকে ফুটপাত থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাঁর দায়িত্বশীল স্বজনদের খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মানবিক সংগঠনগুলোর জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।
আসুন, আমরা শুধু দর্শক হয়ে না থাকি। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। কারণ আজ যিনি ফুটপাতে পড়ে আছেন, তিনি কারও মা, কারও বোন, কারও খালা কিংবা দাদি—হতে পারেন আমাদেরই কোনো আপনজন। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ জাগ্রত হোক। সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠুক এমন একটি মানবিক সমাজ, যেখানে কোনো বৃদ্ধাকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এভাবে অবহেলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকতে হবে না।
শহরের ফুটপাতে পড়ে আছে অসহায় কঙ্কালসার বৃদ্ধা
পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে
